সবরিমালা নিয়ে- অনির্বাণ দাসগুপ্ত।

Share

যেহেতু ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাই না, শবরীমালা নিয়েও আমার মাথাব্যথার কোন কিছু ছিল না । কিন্তু রাজনৈতিক অন্ধত্ব যদি আপনার সব যুক্তিবোধ গিলে খেয়ে না থাকে, পাশাপাশি আপনার মনে কি এই প্রশ্ন গুলোও আসবে না..?

১) নারীবাদ প্রগতিবাদ – বামপন্থীদের সব বাদ কেন শুধু হিন্দু ধর্ম থেকে শুরু হয়ে হিন্দু ধর্মে এসেই থেমে যায়? মসজিদে মসজিদে মুসলিম নারীদের প্রবেশাধিকার, একসঙ্গে নামাজ আদায়ের অধিকার নিয়ে এরা সরব হয় না কেন?
নারীদের প্রতি বৈষম্যকারী পুরুষতান্ত্রিক হিন্দু ধর্মে তো অনেক নারী ধর্মগুরু আছেন, মহিলাদের দিয়ে পূজোও করানো হচ্ছে, কিন্তু একজনও নারী মৌলবী বা পাদ্রী নেই কেন – নারীবাদী বামপন্থীদের তো এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেও কখনো প্রশ্ন তুলতে দেখিনি !

কালো বস্তায় মুড়ে রাখা, বহু বিবাহ, তিন তালাক বা নিকাহ হালালার মতো পুরুষ তান্ত্রিক বর্বর প্রথার বিরোধিতা তো এই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আঁতেল বুদ্ধিজীবীদের কখনো করতে দেখি নি, বরং এসবের বিরোধিতার বিরোধিতা করতে দেখেছি এদের । মুসলিম সমাজের শিক্ষিত অংশ বা বামপন্থী সেজে থাকা কোন মুসলিম ব্যক্তিকেও তো দেখলাম না নিজেদের ধর্মীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে কোনদিন কিছু বলতে । বরং শেহেলা রশিদ বা মীরাতুন নাহার এর মতো শিক্ষিত প্রগতিশীল ব্যাক্তিত্বদের দেখেছি ঠিক উল্টোটা করতে।

২) হিন্দু প্রধান দেশে, হিন্দু প্রধান বামপন্থী রাজ্য কেরালাতে এক মুসলিম প্রতিবাদী নারীকে দেখেছিলাম ন্যাপকিন নিয়ে শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশের চেষ্টা করতে, প্রতিবাদ হিসেবে।

হিন্দু প্রধান দেশে, হিন্দু প্রধান কোন রাজ্যেই, ধরা যাক দিল্লির জামা মসজিদ বা কোলকাতার টিপু সুলতান মসজিদে বা আপনার হিন্দু সংখ্যাগুরু পাড়ার মসজিদেই হিন্দু মহিলাদের সাহস হবে কি ঋতুমতী অবস্থায় বা এভাবেই ন্যাপকিন হাতে জোর করে প্রবেশের চেষ্টা করে প্রতিবাদ জানাতে? জানালে কী কী হবে? বাদ দিন, সাহস হবে কি সাধারণ অবস্থাতেই সাধারণ ভাবে প্রবেশ করার? হিন্দু প্রধান এই ভারতেই…, কী কী হবে..? এরপরও নাকি হিন্দুরা অসহিষ্ণু !

আচ্ছা, মুসলিম নারীরাও কি পাশে থাকবেন…, নারীবাদী বামপন্থীরা ? নাকি তখন এটা হয়ে যাবে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা ?

৩) বামপন্থীরা তো সৃষ্টিকর্তাতেই বিশ্বাসী নয়। তাহলে বামপন্থী নারীদের মন্দিরে ঢোকার এই জেদের উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই পূজো দেওয়া নয়, উদ্দেশ্য নারী পুরুষের বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ । খুব ভালো, কিন্তু তাহলে মসজিদ বা চার্চেও প্রবেশ করে একই ধরনের প্রতিবাদ তারা জানাবেন কি? নাকি এটা আসলে নারী পুরুষের সমান অধিকার আদায়ের লড়াইও নয়, শুধুই হিন্দু বিদ্বেষ, হিন্দু ধর্ম বিদ্বেষ? বামপন্থীদের এরকম উদাহরণ হাজারটা দেওয়া যাবে।

কিন্তু বামপন্থীরা তো সাম্যবাদী, তাহলে শুধু শবরীমালা নিয়ে বৈষম্যের প্রতিবাদ কেন, হাজারো আর সমস্যা নেই, বৈষম্য নেই ? ইউনিফর্ম সিভিল কোড দিয়েই তো শবরীমালা সহ সব সমস্যার বৈষম্যের সমাধান করা যায়। পার্সোনাল ল এর বিরুদ্ধে কোন কথা না বলে জাত ধর্মের রাজনীতি জিইয়ে রেখে সাম্যবাদী সাজতে লজ্জা লাগে না? কেন সব মানুষকে সমান চোখে দেখার লড়াইয়ে তথাকথিত সাম্যবাদীরা সামিল নেই? আমি এখন যদি বলি, এই দেশকে ইরাক সিরিয়া বা পাকিস্তান বানাতে চাই না বলেই সার্বিক জন্ম নিয়ন্ত্রণ আইন চাই, একই দেশে সবার জন্য একই অভিন্ন দেওয়ানী আইন চাই , এতে সাম্যবাদী বামপন্থীদের গা জ্বলবে কেন ?

বৈষম্য বিরোধিতার নামে, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতার নামে বামপন্থীদের যদি এই ধরণের বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িকতা চলতেই থাকে আর সেটার প্রতিক্রিয়ায় আমার মতো ধর্ম না মানা লোকের মধ্যেও যদি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা জেগে ওঠে – খুব দোষ দেওয়া যাবে কি? স্বাধীনতার পরে ৬০ বছর কংগ্রেস সহ ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো রাজত্ব করেছে, তারা এই বিশেষ সম্প্রদায়ের আবেগকে এতো ভয় পেয়েছে যে এমনকি আদালতের রায়কেও আইন করে পাল্টেছে। তাহলে এইরকম একতরফা তোষণ দেখে আরেক সম্প্রদায় যদি একটু উগ্র হয়, সেটা তাদের দোষ নয় বলেই মনে করি। যে সম্প্রদায় এখনো অব্দি উগ্রতা নিয়ে জেদ বজায় রেখে একটা সংস্কারও মানেনি, মানেনি সুপ্রিম কোর্টের রায়ও, তাদের একটু সংস্কার হোক । তাহলে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যেও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা জন্মাবে, তখন তারাও প্রতিক্রিয়াজনিত জেদ ছেড়ে দেবে। এই শবরীমালার মতো তিন তালাক নিয়েও তো আদালত রায় দিয়েছিল, তার বেলা !

সমাজ একটা জীবকোষের মতো, জীবকোষে যেমন একটা অঙ্গাণু পচে নষ্ট হলে অন্য অঙ্গাণুরাও নষ্ট হতে শুরু করে – সমাজেও তেমনি এক সম্প্রদায় ধর্মনিরপেক্ষ, লিঙ্গনিরপেক্ষ আইন কিছুই না মেনে অন্যদের আবেগে আঘাত আর নিজেদের ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি করতেই থাকলে অন্যান্য সম্প্রদায়ও তাদের দেখে গোঁড়া হবেই এবং সেদিকে আঙ্গুল তুলবেই। এর একমাত্র সমাধান কট্টরভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা স্থাপন করা, যার প্রাথমিক ধাপ হল অভিন্ন দেওয়ানী আইন, যেটাকে দরকার হলে সেনা নামিয়ে শুরু করতে হবে ও মানাতে হবে। নচেৎ এভাবে একতরফা ধর্মনিরপেক্ষতার ফলাফল পাল্টা উগ্রতা হলে প্রতিক্রিয়াশীল উগ্রদের দোষ দেওয়া যাবে না, তারা কিন্তু উগ্রতা শুরু করেনি, তারা প্রতিক্রিয়া করেছে মাত্র।

Leave a Reply